শহীদ হাদীর সন্তানের কান্না আর কতকাল রাষ্ট্রকে অভিশাপ দেবে?


 

বিশেষ প্রতিবেদন: > "আচ্ছা, মাঝরাতে হাদি ভাইয়ের সন্তানের কান্নায় যখন তার স্ত্রীর ঘুম ভেঙে যায় এবং পুরো দুনিয়ায় তার নিজেকে সবথেকে অসহায় মনে হয়—তখন কি সে আমাদের অভিশাপ দেয়না?"

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) সাবেক নেতার এই আকুতি আজ শুধু একজন ব্যক্তির প্রশ্ন নয়, বরং এটি দেশের প্রতিটি বিবেকবান নাগরিকের মনের ক্ষোভ ও হতাশার বহিঃপ্রকাশ। ২০২৫ সালের ১২ ডিসেম্বর ভরদুপুরে রাজধানীর পল্টনে গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর ১৮ ডিসেম্বর সিঙ্গাপুরের একটি হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরীফ ওসমান হাদী। হত্যাকাণ্ডের পর দীর্ঘ সময় পার হয়ে গেলেও রাষ্ট্র এখনো এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের পূর্ণাঙ্গ বিচার নিশ্চিত করতে পারেনি।

বারবার পিছিয়েছে তদন্ত প্রতিবেদন, থমকে আছে বিচার

হাদী হত্যাকাণ্ডের তদন্তভার সিআইডির (CID) ওপর ন্যস্ত থাকলেও, সম্পূরক তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার তারিখ বারবার পিছিয়ে যাচ্ছে। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, সিআইডি প্রতিবেদন জমা দিতে ব্যর্থ হওয়ায় আদালত আগামী ১৭ জুন ২০২৬ নতুন তারিখ ধার্য করেছেন। এই নিয়ে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার সময়সীমা প্রায় ১৫ বারের মতো পেছানো হলো। রাষ্ট্রের এই ধীরগতি ও বিচারহীনতার সংস্কৃতি শহীদ হাদীর পরিবারকে চরম এক অনিশ্চয়তা ও মানসিক যন্ত্রণার দিকে ঠেলে দিয়েছে।

এক অসহায় পরিবারের বোবা কান্না

হাদী যখন শাহাদাত বরণ করেন, তখন তিনি পেছনে ফেলে গেছেন তাঁর স্ত্রী এবং এক নবজাতক সন্তানকে। যে শিশুটি পৃথিবীতে এসে বাবার স্নেহ কী তা বোঝার সুযোগই পেল না, মাঝরাতে তার কান্নায় যখন মায়ের বুক ফেটে যায়, তখন সেই অসহায়ত্ব দেখার যেন কেউ নেই। ডাকসু নেতার পোস্টকার্ডে উঠে আসা এই সত্যটি মনে করিয়ে দেয় যে, রাষ্ট্র কেবল একজন সম্ভাবনাময় তরুণ নেতাকেই হারায়নি, বরং একটি পরিবারকে করেছে চিরতরে পঙ্গু। ইসলামের শিক্ষা অনুযায়ী, একজন নিরপরাধ মানুষকে হত্যা করা পুরো মানবজাতিকে হত্যা করার শামিল (সূরা আল-মায়িদাহ: ৩২)। অথচ এই স্বাধীন রাষ্ট্রে আজ সেই হত্যার বিচার পেতে পরিবারকে রাজপথে মশাল মিছিল ও লাগাতার আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দিতে হচ্ছে।

অন্তরালে আন্তর্জাতিক ও দেশীয় ষড়যন্ত্রের ছায়া

হাদী হত্যাকাণ্ডের মূল দুই আসামি ফয়সাল করিম মাসুদ ও আলমগীর শেখ সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে পালিয়ে যায়। যদিও ভারতের পশ্চিমবঙ্গের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বক্তব্য এবং ভারতীয় এনআইএ (NIA)-এর মাধ্যমে আসামিদের দিল্লিতে নিয়ে যাওয়ার খবর গণমাধ্যমে এসেছে, তবুও খুনিদের দেশে ফিরিয়ে এনে বিচারের মুখোমুখি করার ক্ষেত্রে সরকারের দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি নেই। ইনকিলাব মঞ্চের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে যে, এই হত্যাকাণ্ডের পেছনে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক গভীর ষড়যন্ত্র রয়েছে, যা ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা চলছে। শহীদ হাদীর বোন মাসুমা হাদী স্পষ্ট জানিয়েছেন, "আন্তর্জাতিক মহলের নজরদারিতে এবং জাতিসংঘের অধীনে এই হত্যাকাণ্ডের নিরপেক্ষ তদন্ত হতে হবে, তা না হলে আমাদের আন্দোলন থামবে না।"

শেষ কথা

একটি স্বাধীন রাষ্ট্রে দিনের আলোতে একজন নাগরিককে গুলি করে হত্যা করা হবে, আর তার পরিবার বিচারের জন্য মাসের পর মাস আদালতের বারান্দায় ঘুরবে—তা কোনোভাবেই কাম্য নয়। মাঝরাতে শহীদ হাদীর সন্তানের কান্না আর তাঁর স্ত্রীর চোখের জল এই সমাজ ও রাষ্ট্রের বিচারব্যবস্থার দিকে এক বিরাট প্রশ্নবোধক চিহ্ন ছুঁড়ে দেয়। রাষ্ট্রকে অবিলম্বে এই ধোঁয়াশাপূর্ণ অবস্থা থেকে বের হয়ে এসে খুনিদের দেশে ফিরিয়ে আনতে হবে এবং দ্রুততম সময়ে এই হত্যাকাণ্ডের দৃষ্টান্তমূলক বিচার নিশ্চিত করতে হবে। তা না হলে, মজলুমের এই দীর্ঘশ্বাস ও অভিশাপ থেকে রাষ্ট্রের মুক্তি নেই।

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

ভারতের বিষাক্ত আম বর্জন: নেপালের জনস্বাস্থ্য ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার এক সাহসী পদক্ষেপ

ভুক্তিভোগী পরিবারের পাশে শিশির মনির: আদ-দ্বীন হাসপাতালের স্বল্পমূল্যের চিকিৎসা সচল রাখার আকুতি