পল্লবীতে শিশুকে ধর্ষণের পর নৃশংস হত্যা: ১৯ দিনের মাথায় যুক্তিতর্ক শেষ

 

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা: রাজধানীর পল্লবীতে আট বছরের এক শিশুকে ধর্ষণের পর নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনায় দায়ের করা মামলার বিচার প্রক্রিয়া এক অনন্য নজির স্থাপন করতে যাচ্ছে। ঘটনার মাত্র ১৯ দিনের মাথায় আগামী ৭ জুন (রবিবার) এই স্পর্শকাতর মামলার রায় ঘোষণার দিন ধার্য করেছেন আদালত। আজ ঢাকা মহানগর শিশু violence দমন ট্রাইব্যুনালে রাষ্ট্রপক্ষ ও আসামিপক্ষের মধ্যকার চূড়ান্ত যুক্তিতর্ক শুনানি শেষে বিজ্ঞ বিচারক মাসরুর সালেকীন রায়ের এই তারিখ নির্ধারণ করেন।

ফ্ল্যাটের ভেতরেই অবুঝ শিশুর ওপর পাশবিকতা

রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী আজিজুর রহমান দুলু আদালতে যুক্তিতর্ক উপস্থাপনকালে জানান, গত ১৯ মে পল্লবীর একটি ভবনের ফ্ল্যাট থেকে ওই শিশুটির খণ্ডিত লাশ উদ্ধার করা হয়। ঘটনার দিন পাশাপাশি ফ্ল্যাটে বসবাসকারী প্রধান আসামি সোহেল রানা শিশুটিকে ফুঁসলিয়ে নিজের ফ্ল্যাটে নিয়ে যায় এবং সেখানে তাকে ধর্ষণের পর নৃশংসভাবে হত্যা করে। এই লোমহর্ষক হত্যাকাণ্ডের সময় সোহেল রানার স্ত্রী ও মামলার অন্যতম আসামি স্বপ্না আক্তার ভেতর থেকে বাসার দরজা বন্ধ করে রেখেছিলেন। বাইরে থেকে দরজা খোলার জন্য চাপ দেওয়া হলে স্বপ্না ভেতর থেকে "বাসায় কোনো শিশু নেই" বলে মিথ্যা তথ্য দিয়ে অপরাধে সহযোগিতা করেন।

শৌচাগারের গ্রিল কেটে পলায়ন ও স্বীকারোক্তি

হত্যাকাণ্ড সংঘটিত করার পর প্রধান আসামি সোহেল রানা বাসার শৌচাগারের (টয়লেট) গ্রিল ভেঙে তিনতলার জানালা দিয়ে পা বাড়িয়ে পালিয়ে যায়, যা প্রত্যক্ষদর্শী আবু শামা নিজের চোখে দেখেছেন। পরবর্তীতে ঘটনার দিন সন্ধ্যায় নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা থেকে পুলিশ সোহেল রানাকে গ্রেফতার করে। গ্রেফতারের পর গত ২০ মে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে নিজের অপরাধ স্বীকার করে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তি ও জবানবন্দি দেয় সোহেল। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা দ্রুততম সময়ে চার্জশিট দাখিল করলে গত ১ জুন আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরু করেন ট্রাইব্যুনাল।

আদালতে 'ডলার' নাটক ও উভয় পক্ষের যুক্তি

মামলার শুনানির একপর্যায়ে আসামি সোহেল রানা নিজেকে নির্দোষ দাবি করে 'ডলার' নামের এক রহস্যময় ব্যক্তির অবতারণা করে এবং দাবি করে মূল অপরাধ ডলার করেছে। তবে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী আদালতকে মনে করিয়ে দেন যে, ১৬ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য এবং আসামির নিজের মূল জবানবন্দির কোথাও 'ডলার' নামের কোনো ব্যক্তির অস্তিত্ব বা উল্লেখ ছিল না। বিচার প্রক্রিয়াকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করতেই এই কাল্পনিক চরিত্রের আশ্রয় নেওয়া হয়েছে।

অন্যদিকে, আসামিপক্ষের আইনজীবী যুক্তি দেখান যে, আসামি নেশাগ্রস্ত থাকায় তার জবানবন্দির ওপর ভিত্তি করে শাস্তি দেওয়া ঠিক হবে না। এর জবাবে রাষ্ট্রপক্ষ স্পষ্ট করে বলে, অপরাধ সংঘটন এবং জবানবন্দি দেওয়ার সময় আসামি সম্পূর্ণ সুস্থ ও স্বাভাবিক মস্তিষ্কে ছিল।

সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি

রাষ্ট্রপক্ষ থেকে ১৬ জন সাক্ষীর সাক্ষ্যপ্রমাণ এবং শিশুটির বাবা-মায়ের আবেগঘন জবানবন্দি আদালতে পড়ে শোনানো হয়। সমস্ত তথ্য-প্রমাণ ও আইনি যুক্তি শেষে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী প্রধান আসামি সোহেল রানার সর্বোচ্চ শাস্তি (মৃত্যুদণ্ড) এবং তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারের কঠোর আইনানুগ শাস্তি দাবি করেছেন।

মাত্র ১৯ দিনের মধ্যে এই মামলার রায় ঘোষণার সিদ্ধান্ত দেশের বিচার বিভাগের ইতিহাসে একটি দ্রুততম ও ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে বলে মনে করছেন আইনি বিশেষজ্ঞরা। ভুক্তভোগী পরিবারসহ পুরো দেশ এখন ৭ জুনের সেই মাহেন্দ্রক্ষণের দিকে তাকিয়ে আছে, যেখানে নিষ্পাপ শিশুটির আত্মা ও তার পরিবার প্রকৃত ন্যায়বিচার পাবে।



মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

ভারতের বিষাক্ত আম বর্জন: নেপালের জনস্বাস্থ্য ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার এক সাহসী পদক্ষেপ

শহীদ হাদীর সন্তানের কান্না আর কতকাল রাষ্ট্রকে অভিশাপ দেবে?

ভুক্তিভোগী পরিবারের পাশে শিশির মনির: আদ-দ্বীন হাসপাতালের স্বল্পমূল্যের চিকিৎসা সচল রাখার আকুতি