‘Revenge of Nature’ বা প্রকৃতির প্রতিশোধ: প্রচলিত একটি ভুল ধারণা ও ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গি


 

ফেসবুক, ইউটিউব কিংবা বিভিন্ন নিউজ পোর্টালে কোনো বড় প্রাকৃতিক দুর্যোগ, ভূমিকম্প বা মহামারীর খবর দেখলেই আমরা অনেকেই ঝটপট একটা ক্যাপশন বা মন্তব্য লিখে ফেলি— “Revenge of Nature!” বা “প্রকৃতির প্রতিশোধ!”।

শুনতে বা দেখতে কথাটি অনেক আধুনিক কিংবা গভীর মনে হলেও, একজন মুসলিম হিসেবে এই শব্দটি ব্যবহার করার পূর্বে আমাদের সতর্ক হওয়া এবং এর পেছনের সত্যটি জেনে রাখা অত্যন্ত জরুরি। কারণ, অজান্তেই এই একটি শব্দ আমাদের ঈমানের মৌলিক বিশ্বাসের ওপর আঘাত হানতে পারে।

১. প্রকৃতি কি আসলেই প্রতিশোধ নিতে পারে?

ইসলামী আকীদা বা একত্ববাদের (তাওহীদ) মূল কথাই হলো—এই মহাবিশ্বের একমাত্র সৃষ্টিকর্তা, পালনকর্তা এবং নিয়ন্ত্রণকারী হলেন মহান আল্লাহ তাআলা। চন্দ্র, সূর্য, নদী-নালা, পাহাড়-পর্বত কিংবা আবহাওয়া—এই সবকিছুই আল্লাহর সৃষ্টি এবং তাঁর হুকুমের গোলাম।

প্রকৃতির নিজস্ব কোনো প্রাণ, ইচ্ছা বা স্বাধীন ক্ষমতা নেই যে সে নিজে থেকে কারো ওপর ক্ষুব্ধ হবে কিংবা কারো ওপর প্রতিশোধ গ্রহণ করবে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা স্পষ্ট এরশাদ করেছেন:

"জেনে রেখো, সৃষ্টি করা এবং নির্দেশ দেওয়া একমাত্র তাঁরই কাজ।" — সূরা আল-আ'রাফ, আয়াত: ৫৪

তাই প্রকৃতিকে কোনো স্বাধীন সত্তা মনে করে তাকে "প্রতিশোধ গ্রহণকারী" হিসেবে বিশ্বাস করা ইসলামের তাওহীদের ধারণার সাথে সরাসরি সাংঘর্ষিক।

২. তাহলে প্রাকৃতিক দুর্যোগ কেন হয়?

অনেকে বলতে পারেন, মানুষ যখন পরিবেশ ধ্বংস করে, তখন তো সত্যিই বন্যা বা খরা হয়; তাহলে একে প্রকৃতির প্রতিক্রিয়া বলা যাবে না কেন?

আসলে, আল্লাহ তাআলা এই মহাবিশ্বে একটি নির্দিষ্ট নিয়ম বা ‘সিস্টেম’ তৈরি করে দিয়েছেন। মানুষ যখন গাছ কেটে, নদী দূষণ করে সেই নিয়মে আঘাত হানে, তখন আল্লাহর বেঁধে দেওয়া সেই প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যায় এবং দুর্যোগ নেমে আসে। একে ইসলাম মানুষের নিজের কর্মের ফল এবং আল্লাহর পক্ষ থেকে আসা সতর্কবার্তা হিসেবে বর্ণনা করে।

আল-কুরআনে বলা হয়েছে:

"মানুষের কৃতকর্মের দরুন স্থলে ও জলে বিপর্যয় ছড়িয়ে পড়েছে, যার ফলে আল্লাহ তাদেরকে তাদের কোনো কোনো কর্মের শাস্তি আস্বাদন করান, যাতে তারা ফিরে আসে।" — সূরা আর-রূম, আয়াত: ৪১

অর্থাৎ, একে "প্রকৃতির প্রতিশোধ" না বলে বলা উচিত "মানুষের পাপ ও সীমালঙ্ঘনের কারণে আল্লাহর পক্ষ থেকে আসা আজাব বা সতর্কবার্তা।"

৩. মহামারী ও আজাবের আসল কারণ

রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আমাদের সতর্ক করে গিয়েছেন যে, সমাজে যখন অন্যায়, অবিচার ও অশ্লীলতা সীমালঙ্ঘন করে, তখন আল্লাহর পক্ষ থেকে কঠিন পরীক্ষা বা আজাব নেমে আসে।

"যখনই কোনো জাতির মধ্যে প্রকাশ্যে অশ্লীলতা ছড়িয়ে পড়ে, তখনই তাদের মধ্যে মহামারী এবং এমন সব ব্যাধি ছড়িয়ে পড়ে, যা তাদের পূর্বপুরুষদের যুগে ছিল না।" — সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস নং: ৪০১৯

এখানেও মূল চালিকাশক্তি প্রকৃতি নয়, বরং মানুষের কর্ম এবং আল্লাহর বিচার।

আমাদের করণীয়:

আমরা অনেক সময় ট্রেন্ডের টানে বা অবহেলাবশত এমন অনেক শব্দ ব্যবহার করি, যা আমাদের বিশ্বাসের পরিপন্থী। "Revenge of Nature" বা "প্রকৃতির প্রতিশোধ" শব্দ দুটি ধর্মনিরপেক্ষ বা নাস্তিক্যবাদী দৃষ্টিভঙ্গি থেকে ঠিক মনে হলেও, একজন মুমিনের ভাষা এমন হওয়া উচিত নয়।

তাই যেকোনো দুর্যোগে প্রকৃতিকে দোষ না দিয়ে বা প্রকৃতিকে ক্ষমতার অধিকারী না বানিয়ে, আমাদের উচিত আল্লাহর দরবারে ইস্তিগফার (ক্ষমা প্রার্থনা) করা, নিজেদের সংশোধন করা এবং পরিবেশের প্রতি যত্নশীল হওয়া।

আসুন, নিজে সচেতন হই এবং ভুল শব্দ বা পরিভাষা ব্যবহার থেকে বেঁচে থেকে অন্য ভাই-বোনদেরও সচেতন করি। আল্লাহ আমাদের সঠিক বুঝ দান করুন। আমীন।

(হাদীসের সোর্স: সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস নং ৪০১৯)

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

ভারতের বিষাক্ত আম বর্জন: নেপালের জনস্বাস্থ্য ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার এক সাহসী পদক্ষেপ

শহীদ হাদীর সন্তানের কান্না আর কতকাল রাষ্ট্রকে অভিশাপ দেবে?

ভুক্তিভোগী পরিবারের পাশে শিশির মনির: আদ-দ্বীন হাসপাতালের স্বল্পমূল্যের চিকিৎসা সচল রাখার আকুতি